বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ নানা সমস্যা, দুঃখ বা রোগ থেকে মুক্তি পেতে তান্ত্রিক কবিরাজের কাছে যায়। অনেক সময় তারা অদ্ভুত পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। এর ফলে কেউ কেউ শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো — যদি কেউ তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কী করা উচিত?
তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসায় ক্ষতির ধরন
১. শারীরিক ক্ষতি:
তান্ত্রিক কবিরাজ অনেক সময় এমন কিছু ওষুধ বা পদ্ধতি ব্যবহার করে যা শরীরের ক্ষতি করতে পারে। যেমন: ভুল ভেষজ ব্যবহার, খাদ্যনিষেধ, বা বিপজ্জনক পদার্থের প্রয়োগ।
২. মানসিক ক্ষতি:
কেউ কেউ মানসিকভাবে প্রভাবিত হন বা ভয়, উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগেন।
৩. আর্থিক ক্ষতি:
ভুল চিকিৎসার জন্য অনেকেই প্রচুর টাকা ব্যয় করে প্রতারিত হন।
৪. সামাজিক ক্ষতি:
কখনো কখনো এসব চিকিৎসা পরিবারে বিভ্রান্তি বা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে।
আইন অনুযায়ী তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশে অপ্রমাণিত চিকিৎসা বা প্রতারণামূলক চিকিৎসা দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০ অনুযায়ী, শুধুমাত্র নিবন্ধিত চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিতে পারেন।
এছাড়া, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা প্রতারণার জন্য অভিযোগ করা যায়।
সূত্র: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর – https://www.dncrp.gov.bd
যদি কেউ তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কী করা উচিত
১. প্রথমে চিকিৎসকের কাছে যান:
যদি শারীরিক সমস্যা হয়, দ্রুত একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. প্রমাণ সংগ্রহ করুন:
চিকিৎসার সময়কার ছবি, রসিদ, বা সাক্ষী সংগ্রহ করুন।
৩. থানায় অভিযোগ করুন:
অভিযোগ করলে পুলিশ আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।
৪. ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন:
আপনি চাইলে সরাসরি অনলাইনে অভিযোগ করতে পারেন: https://www.dncrp.gov.bd
৫. আইনজীবীর সহায়তা নিন:
যদি আর্থিক বা মানসিক ক্ষতি হয়ে থাকে, আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দাবি করা সম্ভব।
ক্ষতির পরে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের উপায়
- আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে পুনরায় পরীক্ষা করান।
- মানসিক পরামর্শ নিন, যদি ভয় বা উদ্বেগ তৈরি হয়।
- পরিবার বা বন্ধুদের সহায়তা নিন, যাতে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
জনসচেতনতা বাড়ানোর উপায়
- শিক্ষা ও প্রচার: গ্রামে ও শহরে সচেতনতা কর্মসূচি করা উচিত।
- মিডিয়ার ভূমিকা: টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তথ্যভিত্তিক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
- সরকারি উদ্যোগ: স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রতারণামূলক চিকিৎসা বন্ধে অভিযান চালানো দরকার।
সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর – https://www.dghs.gov.bd
বাংলাদেশে এই বিষয়ে আইন ও নীতিমালা
বাংলাদেশে বর্তমানে যে আইনগুলো প্রযোজ্য:
১. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯
২. প্রতারণা দমন আইন ১৮৬০
৩. মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০
৪. মাদক ও রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮
এই আইনগুলোর আওতায় তান্ত্রিক কবিরাজদের অননুমোদিত চিকিৎসা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
সূত্র: Bangladesh Law Commission – https://www.lawcommission.gov.bd
উপসংহার
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। কেউ যদি তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাকে ভয় না পেয়ে আইনগত ও চিকিৎসাগত সহায়তা নিতে হবে। সরকার, মিডিয়া ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় এ ধরনের প্রতারণামূলক চিকিৎসা বন্ধ করা সম্ভব।
তাই মনে রাখুন, যদি কেউ তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কী করা উচিত — তার প্রথম উত্তর হলো সচেতনতা ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া।
FAQs (প্রশ্নোত্তর)
১. যদি কেউ তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কী করা উচিত?
প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, প্রমাণ সংগ্রহ করুন এবং থানায় বা ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন।
২. তান্ত্রিক কবিরাজের চিকিৎসা কি বৈধ?
না, যদি তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত না হয় বা তারা নিবন্ধিত না হন, তবে তা বেআইনি।
৩. ক্ষতির পরে কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়?
আদালতে মামলা করলে এবং প্রমাণ উপস্থাপন করলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব।
৪. কোথায় অভিযোগ করা যায়?
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP), স্থানীয় থানা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযোগ করা যায়।
৫. কিভাবে মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করা যায়?
শিক্ষা, মিডিয়া প্রচারণা এবং সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।

