বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে তান্ত্রিক কবিরাজদের কাছে যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই তথাকথিত তান্ত্রিক কবিরাজরা প্রতারণা করে সাধারণ মানুষকে ক্ষতির মুখে ফেলে। তাই প্রশ্ন ওঠে, তান্ত্রিক কবিরাজের বিরুদ্ধে আইন আছে কি এবং আইন কীভাবে এদের নিয়ন্ত্রণ করে?
তান্ত্রিক কবিরাজ কারা এবং তাদের কার্যক্রম
তান্ত্রিক কবিরাজ সাধারণত আধ্যাত্মিক শক্তি বা তন্ত্র-মন্ত্র ব্যবহার করে মানুষকে চিকিৎসা বা সমাধানের আশ্বাস দেন। কেউ কেউ সত্যিই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা জানেন, কিন্তু অধিকাংশই ভণ্ড বা প্রতারক, যারা অর্থ হাতিয়ে নিতে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়।
তাদের কার্যক্রমের মধ্যে আছে ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র পড়া, ওষুধ বিক্রি, এবং অলৌকিক শক্তির দাবি।
সূত্র: Banglapedia – Folk Healing in Bangladesh
তান্ত্রিক কবিরাজের বিরুদ্ধে আইন আছে কি: বাস্তব অবস্থা
বাংলাদেশে সরাসরি “তান্ত্রিক কবিরাজ আইন” নামে কোনো আলাদা আইন নেই। তবে বিভিন্ন বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তাদের প্রতারণা বা ভুয়া চিকিৎসা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
১. বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ (Penal Code):
- প্রতারণা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা কারও ক্ষতির উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে শাস্তি প্রযোজ্য।
- ধারা ৪২০ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
২. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯:
- ভোক্তাকে ভুল তথ্য দিয়ে ওষুধ বা চিকিৎসা বিক্রি করলে এ আইন অনুযায়ী মামলা করা যায়।
- এ ধরনের অপরাধে জরিমানা ও কারাদণ্ড হতে পারে।
৩. ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA):
- DGDA-এর অনুমোদন ছাড়া কোনো ভেষজ বা চিকিৎসা পণ্য বিক্রি করা আইনত অপরাধ।
- DGDA তত্ত্বাবধানে ওষুধ ও ভেষজ পণ্যের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
৪. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (ICT Act):
- অনলাইনে তান্ত্রিক প্রতারণা বা বিজ্ঞাপন দিলে এই আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সূত্র: Law Commission Bangladesh – https://www.lawcommission.gov.bd
তান্ত্রিক কবিরাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জায়গা
১. স্থানীয় থানায় অভিযোগ:
প্রতারণা বা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ থানায় করা যায়। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর মামলা নেয়।
২. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP):
ভুল তথ্য বা ক্ষতিকর পণ্য বিক্রির অভিযোগ অনলাইনে জমা দেওয়া যায়।
ওয়েবসাইট: https://www.dncrp.gov.bd
৩. স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও DGDA:
নিবন্ধনবিহীন চিকিৎসা বা ভেষজ ওষুধ বিক্রির অভিযোগ DGDA তে করা যায়।
ওয়েবসাইট: https://www.dgda.gov.bd
৪. জাতীয় মানবাধিকার কমিশন:
মানসিক বা সামাজিক ক্ষতির অভিযোগ এই কমিশনে দাখিল করা যায়।
ওয়েবসাইট: https://www.nhrc.org.bd
আইন প্রয়োগে চ্যালেঞ্জ ও জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা
তান্ত্রিক কবিরাজদের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগে নানা বাধা আছে।
- মানুষ অনেক সময় ভয় বা লজ্জার কারণে অভিযোগ করে না।
- অনেকেই এখনো বিশ্বাস করে এসব কাজ বাস্তবিকভাবে ফলপ্রসূ।
- প্রশাসনিক নজরদারি কম হওয়ায় অনেক ভণ্ড তান্ত্রিক মুক্তভাবে প্রতারণা চালিয়ে যায়।
তাই মানুষের মধ্যে আইনি সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানের প্রসার বাড়ানো জরুরি।
সরকারি উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
সরকারের উচিত তান্ত্রিক কবিরাজদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে “বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা”র গুরুত্ব প্রচার করলে এসব প্রতারণা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সূত্র: The Daily Star – Superstition and Law
উপসংহার
তান্ত্রিক কবিরাজদের ভণ্ডামি ও প্রতারণা সমাজে ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হচ্ছে। যদিও “তান্ত্রিক কবিরাজের বিরুদ্ধে আইন আছে কি” প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো – হ্যাঁ, আছে, তবে তা বিভিন্ন বিদ্যমান আইনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়।
তাই মানুষকে সচেতন হয়ে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
FAQs (প্রশ্নোত্তর)
১. তান্ত্রিক কবিরাজের বিরুদ্ধে আইন আছে কি?
হ্যাঁ, দণ্ডবিধি ১৮৬০, ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ এবং DGDA বিধি অনুযায়ী প্রতারণা ও অবৈধ চিকিৎসা শাস্তিযোগ্য।
২. যদি কেউ তান্ত্রিক কবিরাজের প্রতারণায় পড়ে, কী করা উচিত?
স্থানীয় থানায় মামলা করুন অথবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন।
৩. DGDA কীভাবে তান্ত্রিক কবিরাজদের নিয়ন্ত্রণ করে?
DGDA অনুমোদন ছাড়া কেউ ভেষজ বা চিকিৎসা সংক্রান্ত পণ্য বাজারজাত করতে পারে না।
৪. অনলাইনে তান্ত্রিক বিজ্ঞাপন দিলে কি শাস্তি হয়?
হ্যাঁ, ICT আইনে শাস্তি হতে পারে এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিট ব্যবস্থা নিতে পারে।
৫. অভিযোগ করতে কি প্রমাণ লাগে?
হ্যাঁ, ছবি, রসিদ, সাক্ষ্য বা অডিও প্রমাণ অভিযোগের শক্তি বাড়ায়।

