বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে আজও তান্ত্রিক কবিরাজের প্রভাব প্রবল।
অনেক মানুষ এখনো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বদলে ঝাড়ফুঁক, তাবিজ বা মন্ত্রে বিশ্বাস রাখে।
এই কারণে সমাজে কুসংস্কার বাড়ছে, এবং অনেক সময় রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পেতে দেরি করে।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে — কীভাবে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে তান্ত্রিক কবিরাজের সচেতনতা বাড়ানো যায়?
তান্ত্রিক কবিরাজ কারা এবং তাদের ভূমিকা
তান্ত্রিক কবিরাজ সাধারণত ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেন বলে দাবি করেন।
তারা মন্ত্র, তাবিজ বা ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে রোগ নিরাময় করেন বলে অনেকে মনে করেন।
বাংলাদেশের লোকজ সমাজে তারা দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়, বিশেষত যেখানে আধুনিক চিকিৎসা পৌঁছেনি।
গ্রামীণ জনগণের মধ্যে তান্ত্রিক কবিরাজে বিশ্বাসের কারণ
- শিক্ষার অভাব: অনেকেই জানেন না কোন রোগে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
- চিকিৎসা সুবিধার অভাব: প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য নয়।
- ধর্মীয় বিশ্বাস: মানুষ মনে করে আধ্যাত্মিক পদ্ধতিতে রোগ সারানো যায়।
- সামাজিক চাপ: পরিবার বা প্রতিবেশীর প্রভাবে মানুষ তান্ত্রিক কবিরাজের কাছে যায়।
তান্ত্রিক কবিরাজের নেতিবাচক প্রভাব
তান্ত্রিক কবিরাজের ভ্রান্ত চিকিৎসায় অনেক সময় রোগের অবস্থা খারাপ হয়।
ভণ্ড তান্ত্রিকরা মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে।
তারা বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা থেকে মানুষকে দূরে রাখে, ফলে জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
World Health Organization – Bangladesh বলছে, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতি নিরাপদ নয়।
কীভাবে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে তান্ত্রিক কবিরাজের সচেতনতা বাড়ানো যায়
১. শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে:
গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা বিস্তার করলে মানুষ যুক্তিসঙ্গতভাবে চিন্তা করতে শিখবে।
স্কুল-কলেজে স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
২. স্বাস্থ্যকর্মী ও সমাজকর্মীদের ভূমিকা:
Community Clinic Bangladesh এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে সচেতন করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে তান্ত্রিক কবিরাজের ক্ষতিকর দিক ব্যাখ্যা করতে পারেন।
৩. সরকারি উদ্যোগ ও প্রচারণা:
DGHS Bangladesh নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রোগ্রাম চালায়।
রেডিও, টেলিভিশন ও গ্রামীণ সভার মাধ্যমে প্রচার চালানো যেতে পারে।
৪. ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততা:
ইমাম, শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের সচেতন করে জনগণের মধ্যে বার্তা পৌঁছানো কার্যকর হতে পারে।
৫. সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমের ব্যবহার:
ফেসবুক, ইউটিউব, স্থানীয় টিভি চ্যানেল ও ব্লগে তান্ত্রিক কবিরাজের বাস্তব ক্ষতির গল্প প্রচার করলে মানুষ সচেতন হবে।
সরকার ও এনজিওদের ভূমিকা
সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠন একসাথে কাজ করলে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব।
যেমন:
- গ্রামীণ স্বাস্থ্য মেলা আয়োজন
- কুসংস্কারবিরোধী নাটক বা নাট্যাভিনয়
- নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্পেইন
- যুব সংগঠনের মাধ্যমে প্রচারণা
BRAC, ASA এবং CARE Bangladesh ইতিমধ্যে অনেক এলাকায় এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।
তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
তরুণরা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।
তারা সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ, ইউটিউব ও স্থানীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে বার্তা ছড়াতে পারে।
স্কুল ও কলেজে স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্লাব গঠন করা যেতে পারে।
সচেতনতা বৃদ্ধিতে মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা
মিডিয়া সমাজের আয়না।
তান্ত্রিক কবিরাজের ভ্রান্ত চিকিৎসার বিপদ তুলে ধরতে সংবাদ, টক শো, নাটক ও ভিডিও তৈরি করা প্রয়োজন।
Bangladesh Television (BTV) এবং স্থানীয় পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতা প্রচার করা যেতে পারে।
উপসংহার
সচেতনতা বাড়ানো মানে শুধু তথ্য দেওয়া নয়, মানুষের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করা।
কীভাবে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে তান্ত্রিক কবিরাজের সচেতনতা বাড়ানো যায়— এর উত্তর হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গণমাধ্যম ও সামাজিক সহযোগিতা।
যখন মানুষ বৈজ্ঞানিক যুক্তি বুঝবে, তখন কুসংস্কার নিজেই হ্রাস পাবে।
FAQs (প্রশ্নোত্তর)
১. কীভাবে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে তান্ত্রিক কবিরাজের সচেতনতা বাড়ানো যায়?
শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্পেইন এবং স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
২. কেন মানুষ এখনও তান্ত্রিক কবিরাজে বিশ্বাস করে?
ধর্মীয় বিশ্বাস, শিক্ষার অভাব এবং চিকিৎসা সুবিধার অভাবে।
৩. তান্ত্রিক কবিরাজের বিরুদ্ধে আইন আছে কি?
প্রতারণা বা আর্থিক ক্ষতি করলে বিদ্যমান আইনে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
৪. সরকার কী করছে এই বিষয়ে?
DGHS Bangladesh এবং Community Clinic Bangladesh গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে।
৫. কুসংস্কার কমাতে ব্যক্তিগতভাবে কী করা যায়?
নিজে সচেতন থাকা, পরিবার ও প্রতিবেশীদের সত্য তথ্য জানানো এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় উৎসাহ দেওয়া।


