ভেষজ চিকিৎসা মানুষের জীবনের প্রাচীনতম চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর একটি। যখন আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না, তখন মানুষ গাছপালা, মূল, পাতা, ফুল ও ফল ব্যবহার করে রোগ নিরাময় করত। তাই প্রশ্ন জাগে – ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্য কোথা থেকে শুরু?
এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুধু প্রাকৃতিক নয়, এটি হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
ভেষজ চিকিৎসা কী
ভেষজ চিকিৎসা হলো এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে প্রাকৃতিক গাছপালা ও উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করে রোগ নিরাময় করা হয়।
এতে কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক ব্যবহৃত হয় না।
এই চিকিৎসা পদ্ধতির মূল দর্শন হলো – প্রকৃতি নিজেই মানুষের রোগ নিরাময়ের উৎস।
ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্য কোথা থেকে শুরু: প্রাচীন উৎস
ভেষজ চিকিৎসার সূচনা হাজার বছর আগে। ইতিহাস অনুযায়ী –
- ভারতীয় আয়ুর্বেদ:
প্রায় ৩,০০০ বছর আগে ভারতের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শুরু হয়। এখানে “চরক সংহিতা” ও “সুশ্রুত সংহিতা” নামে দুটি বিখ্যাত গ্রন্থে শত শত ভেষজ উদ্ভিদের বর্ণনা পাওয়া যায়। - চীনের প্রাচীন চিকিৎসা:
প্রায় ২,৫০০ বছর আগে চীনে “Traditional Chinese Medicine (TCM)” চালু হয়। এতে জিনসেং, লিকোরিস, ও গ্রিন টি সহ বহু ভেষজ উপাদান ব্যবহার হতো। - মিশর ও গ্রীস:
প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা অ্যালো ভেরা, রসুন ও মধু ব্যবহার করতেন। গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসও ভেষজ চিকিৎসার প্রচার করেন। - বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্য:
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে কবিরাজরা প্রজন্ম ধরে ভেষজ চিকিৎসা করে আসছেন। স্থানীয়ভাবে “গাছগাছড়া চিকিৎসা” বা “লোকজ চিকিৎসা” নামে পরিচিত এই পদ্ধতি আজও টিকে আছে।
Read More: Banglapedia – Herbal Medicine in Bangladesh
বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসার বিকাশ
বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসা মূলত আয়ুর্বেদ ও ইউনানি পদ্ধতির মাধ্যমে বিস্তৃত হয়।
ব্রিটিশ আমলে আয়ুর্বেদিক শিক্ষা ও ওষুধ উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর DGDA (Directorate General of Drug Administration) ভেষজ ওষুধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বর্তমানে দেশে শতাধিক ভেষজ ওষুধ কোম্পানি রয়েছে, যারা DGDA অনুমোদিতভাবে ওষুধ উৎপাদন করছে।
Source: DGDA Official Website
ভেষজ চিকিৎসা ও ধর্মীয় প্রভাব
- ইসলামিক চিকিৎসা: তিব্বে নববী অনুযায়ী অনেক ভেষজ উপাদান যেমন কালোজিরা, মধু, খেজুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো।
- হিন্দু ধর্ম: আয়ুর্বেদ শাস্ত্র হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
- বৌদ্ধ ধর্ম: বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও প্রাচীন কালে গাছপালা দিয়ে চিকিৎসা করতেন।
এই ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলো ভেষজ চিকিৎসার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আধুনিক সময়ে ভেষজ চিকিৎসার ভূমিকা
আজকের দিনে ভেষজ চিকিৎসা কেবল গ্রামীণ পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে।
- DGDA অনুমোদিত ভেষজ ওষুধের উৎপাদন বাড়ছে।
- ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ শিল্প ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে।
- সরকারি নীতিমালায় ভেষজ চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
Read More: Ministry of Health and Family Welfare Bangladesh
ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০০২ সাল থেকে ভেষজ চিকিৎসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
WHO-এর Traditional Medicine Strategy অনুযায়ী, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে তাদের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি সংরক্ষণ ও বিকাশে উৎসাহিত করা হয়েছে।
Read More: WHO – Traditional Medicine Strategy
ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্য রক্ষার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন:
১. স্থানীয় ঔষধি উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা
২. নতুন ভেষজ উদ্ভিদের গবেষণা
৩. প্রশিক্ষিত ভেষজ চিকিৎসক তৈরি
৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধি
৫. সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্য কোথা থেকে শুরু — তার শিকড় প্রাচীন সভ্যতার মাটিতে গভীরভাবে প্রোথিত।
ভারত, চীন ও বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি এই চিকিৎসা পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেছে।
বর্তমানে গবেষণা ও সরকারি উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের ভেষজ চিকিৎসা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে.
FAQs (প্রশ্নোত্তর)
১. ভেষজ চিকিৎসার ঐতিহ্য কোথা থেকে শুরু?
প্রাচীন ভারত, চীন ও মিশরে ভেষজ চিকিৎসার সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
২. বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসা কখন থেকে প্রচলিত?
প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামীণ সমাজে ভেষজ চিকিৎসা প্রচলিত ছিল, যা এখন DGDA-এর তত্ত্বাবধানে নিয়ন্ত্রিত।
৩. ভেষজ চিকিৎসা কি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত?
অনেক ভেষজ উপাদানের কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, যেমন হলুদ, তুলসী, আদা ইত্যাদি।
৪. ভেষজ চিকিৎসা কে নিয়ন্ত্রণ করে?
বাংলাদেশে DGDA (Directorate General of Drug Administration) ভেষজ ওষুধের অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে।
৫. ভবিষ্যতে ভেষজ চিকিৎসার গুরুত্ব কতটা?
প্রাকৃতিক চিকিৎসার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে, তাই ভবিষ্যতে এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে।

