বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
গ্রামীণ সমাজে অনেকেই এখনো আয়ুর্বেদ, ইউনানি বা প্রাকৃতিক উপায়ে চিকিৎসা নেয়।
কিন্তু বর্তমানে ভেষজ ওষুধের গুণমান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তাই জানা জরুরি — বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসা কে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কীভাবে এই ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
ভেষজ চিকিৎসা কী এবং এর গুরুত্ব
ভেষজ চিকিৎসা হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে উদ্ভিদ, শিকড়, পাতা, ফল ইত্যাদি ব্যবহার করে রোগ নিরাময় করা হয়।
এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া প্রাকৃতিক উপায়ে চিকিৎসা করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৮০% মানুষ কোনো না কোনোভাবে ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে।
World Health Organization – Traditional Medicine
বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসার ইতিহাস ও বিকাশ
বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ চিকিৎসার প্রচলন রয়েছে।
গ্রামীণ কবিরাজ ও তান্ত্রিকদের পাশাপাশি আয়ুর্বেদ ও ইউনানি পদ্ধতি জনপ্রিয় ছিল।
আধুনিক যুগে এই চিকিৎসা পদ্ধতি বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং বাণিজ্যিকভাবে প্রসারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসা কে নিয়ন্ত্রণ করে
১. স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW):
ভেষজ চিকিৎসার নীতিমালা ও আইনি কাঠামো তদারকি করে।
২. বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড:
এই বোর্ড ভেষজ চিকিৎসক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ওষুধ প্রস্তুতকারীদের অনুমোদন দেয়।
Bangladesh Board of Unani and Ayurvedic Systems of Medicine
৩. ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA):
ভেষজ ওষুধ উৎপাদন, বিপণন ও মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে।
Directorate General of Drug Administration (DGDA)
৪. বাংলাদেশ ন্যাচারাল মেডিসিন অ্যাসোসিয়েশন:
এটি একটি বেসরকারি সংগঠন, যারা নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা করে।
ভেষজ ওষুধের উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ
ভেষজ ওষুধ উৎপাদনে GMP (Good Manufacturing Practice) অনুসরণ বাধ্যতামূলক।
DGDA ও ISO মান যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রতিটি ওষুধের গুণমান নির্ধারণ করা হয়।
যে প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন ছাড়া পণ্য তৈরি করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ভেষজ চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণের আইন ও নীতিমালা
- বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক আইন, ১৯৮৩ – ভেষজ চিকিৎসার প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করে।
- বাংলাদেশ ফার্মেসি আইন, ১৯৪৬ – ওষুধ বিক্রয় ও নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করে।
- DGDA নীতিমালা (Updated 2022) – ভেষজ ওষুধ নিবন্ধন ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
বিস্তারিত জানতে দেখুন: DGDA Herbal Medicine Guidelines
ভেষজ চিকিৎসার চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
চ্যালেঞ্জ:
- ভেজাল বা অপ্রমাণিত ওষুধ
- বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভাব
- পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা
সুযোগ:
- আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্ভাবনা
- দেশীয় উদ্ভিদের ব্যবহার
- স্থানীয় কৃষকদের আয় বৃদ্ধি
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সরকারী উদ্যোগ
সরকার ভেষজ চিকিৎসা গবেষণায় বিনিয়োগ করছে।
MOHFW নতুন ভেষজ গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করছে।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আয়ুর্বেদ ও ভেষজ চিকিৎসায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে।
উপসংহার
বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসা কে নিয়ন্ত্রণ করে—এই প্রশ্নের উত্তর হলো এটি একটি যৌথ ব্যবস্থা, যেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, DGDA, এবং ইউনানি-আয়ুর্বেদিক বোর্ড একসাথে কাজ করে।
যদি মান নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা বাড়ানো যায়, তবে ভেষজ চিকিৎসা বাংলাদেশে একটি নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।
FAQs (প্রশ্নোত্তর)
১. বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসা কে নিয়ন্ত্রণ করে?
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, DGDA এবং বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড যৌথভাবে ভেষজ চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণ করে।
২. ভেষজ ওষুধ উৎপাদনের জন্য কি অনুমোদন লাগে?
হ্যাঁ, DGDA-এর নিবন্ধন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ভেষজ ওষুধ উৎপাদন করতে পারে না।
৩. বাংলাদেশে ভেষজ চিকিৎসার জন্য কোনো আইন আছে কি?
হ্যাঁ, বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক আইন, ১৯৮৩ অনুযায়ী এই খাত নিয়ন্ত্রিত হয়।
৪. DGDA কিভাবে ভেষজ ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করে?
তারা ওষুধের গুণমান, নিরাপত্তা এবং বাজারজাতকরণ যাচাই করে অনুমোদন প্রদান করে।
৫. ভেষজ চিকিৎসার ভবিষ্যৎ কেমন?
গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের একটি বড় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।


